ন্যাভিগেশন মেনু

আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির ভূয়শী প্রশংসা

গণতন্ত্র, সরব গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশের অগ্রগতি, প্রবৃদ্ধিতে মুগ্ধ আইআরআই, এবং এনডিআই


আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির ভূয়শী প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ সফর করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী দুটি সংগঠন-- ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই)।

প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণমাধ্যমের প্রাণবন্ত ও সক্রিয় ভূমিকা, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি এবং দুর্যোগ-মহামারি মোকাবেলায় সরকারের দৃঢ়তা এবং সফলতার সাথে এসব মোকাবেলা করার জন্যেও সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।  

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা গত ৮ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফরশেষে গতকাল রোববার একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা বলেছেন যে, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টিসহ এব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ায় ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে।

আইআরআই এবং এনডিআই বলেছে যে, তারা আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নীতিমালার ঘোষণা অনুযায়ী এই মিশন পরিচালনা করেছে। এনডিআই এবং আইআরআই অলাভজনক, এবং নির্দলীয় সংস্থা, যারা বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন ও শক্তিশালী করার জন্য নাগরিকদের অংশগ্রহণ, এবং সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তারা বলেন, সক্রিয় সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে নাগরিক সম্পৃক্ত এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য রয়েছে। কয়েক দশক ধরে দেশটি শক্তিশালি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। সফলভাবে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলা করেছে। পরিবেশগত উন্নয়ণে সমৃদ্ধি দেখিয়েছে। এই অর্জনগুলো দেশটির ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে।

বিবৃতিতে, উভয় সংস্থাই বলেছে যে, প্রাক-নির্বাচনী এই প্রতিনিধিদলের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা। পাশাপাশি, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এমন বিষয়গুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবণা দেওয়া।

প্রতিনিধিদলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আইআরআই কো-চেয়ার বনি গ্লিক, ইউএসএআইডি এর সাবেক ডেপুটি প্রশাসক কার্ল এফ ইন্ডারফুর্থ (এনডিআই কো-চেয়ার), দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাবেক সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া চিন আবদুল্লাহ, হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভের প্রাক্তন সদস্য (মালয়েশিয়া) জামিল জাফর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির সাবেক সহযোগী কাউন্সেল জোহানা কাও, আইআরআই এর সিনিয়র ডিরেক্টর (এশিয়া-প্যাসিফিক) মনপ্রীত সিং আনন্দ, এনডিআই আঞ্চলিক ডিরেক্টর, এশিয়া-প্যাসিফিক।

সফরকালে এনডিআই এবং আইআরআই প্রতিনিধিদের সাথে উভয় সংগঠনের প্রযুক্তিগত ও রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা যুক্ত ছিলেন।

প্রতিনিধি দলের চারদিনব্যাপী এই সফরকালে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিভিন্ন মন্ত্রী, সরকারি বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা; বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল; সংসদের বর্তমান ও প্রাক্তন নারী সদস্য, বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, বিভিন্ন আইনজীবী এবং আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সাথে আলাদা আলাদা বৈঠক করেন।

বিবৃতিতে প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশন, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন পক্ষের বিবেচনার জন্য কিছু সুপারিশ পেশ করে।

তারা বলেন যে, এই সুপারিশগুলি যদি নির্বাচন প্রাককালে এবং পরবর্তী সময়েও আমলে নেয়া হয়, তবে সেগুলি যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক এবং অহিংস নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক হতে পারে, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরো এগিয়ে  নিতে পারে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন ও শক্তিশালী করার মানসেই এই প্রাক-নির্বাচনী বিবৃতিটি দিয়েছে।

পর্যবেক্ষণে তারা উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান এবং আইনি কাঠামোতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং তার অধীনে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সুস্পষ্ট অনেক নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন এবং আরো শক্তিশালি করার জন্য বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে বিভিন্ন আইন পাস করেছে। নির্বাচন কমিশন যাতে বিশ্বাসযোগ্য এবং অহিংস নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে সেই প্রক্রিয়াগুলিকে সুগম করার জন্য সরকারের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

তারা বলেন, নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মৌলিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনী ফলাফলের প্রতি ভোটারদের আস্থা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অধিকতর স্বাধীনতা করার জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যেগ লক্ষনীয়।

বিবৃতিতে তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, সুষ্ঠু প্রকিয়ার মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বাছাই করার জন্য সরকার গত যে ২০২১ সালে একটি স্বচ্ছ এবং পরামর্শমূলক প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছিল। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্ব স্ব ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে সংলাপের আয়োজন করা হয়েছিল। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের ব্যবহার প্রক্রিয়াকে বাতিল করার ক্ষেত্রে সমালোচকদের মতামতকে মূল্যায়ণ করা হয়েছে।

উপরন্তু, সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় এবং স্থানীয় বিভিন্ন নির্বাচনে বিরোধী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে, যা নির্বাচনী নিরপেক্ষতার একটি মাত্রা নির্দেশ করে। আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে, তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায় এবং তারা আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের আহ্বান জানিয়েছে।

তারা বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে এবং যথাসময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য তাদের প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। ইতপূর্বে ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। পাশাপাশি, ৬ লাখেরও বেশি নির্বাচনী কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এসকল প্রশিক্ষিত কর্মী ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রের দ্বায়ীত্ব পালন করবেন।

বিবৃতিতে তারা এসব ক্ষেত্রে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিঙ্গ ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য প্রস্তাব করেন। যুবসমাজের শক্তিশালি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করারও সুপারিশ করা হয়।

তারা উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের যেসব ব্যক্তি এবং প্রতিনিধির সাথে বৈঠক কেরন, তারা নির্বাচনী প্রস্তুতি বা ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।

নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতাকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দাতারা বলেছেন, গত ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনসহ বিগত নির্বাচন বিষয়ে নির্বাচন কমিশন তার ওয়েবসাইটে বিশ্লেষণযোগ্য ফর্ম্যাটে ভোট কেন্দ্র-পর্যায়ের ফলাফল সরবরাহ করেছে, যা স্বচ্ছতার একটি প্রশংসনীয় লক্ষণ। আসন্ন নির্বাচনের জন্য, প্রতিনিধি দল নির্বাচনী তথ্যের স্বচ্ছতার অব্যাহত প্রদর্শন হিসাবে একইভাবে বিশ্লেষণযোগ্য বিন্যাসে ফলাফল প্রকাশ করতে নির্বাচন কমিশনকে উৎসাহিত করে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের আইনগত দায়িত্ব রয়েছে ইসির।

নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তারা বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে ভোটার, প্রচার কর্মী, প্রার্থী, পর্যবেক্ষক এবং ভোটকর্মী হিসেবে নারীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে গত তিন দশকের বেশির ভাগ সময় ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন। নারী রাজনৈতিক কর্মী এবং নির্বাচিত নারীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। আদিবাসি এবং উপ-জাতি সম্প্রদায়ের উল্লখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে।

প্রাক নির্বাচনী মার্কিন পর্যবেক্ষক দল আরো উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে বহু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং সম্প্রদায়-ভিত্তিক সংস্থাসহ একটি বৈচিত্র্যময় এবং সক্রিয় নাগরিক রয়েছে যারা মানবিক ত্রাণ, আইনি সহায়তা, পরিষেবা বিতরণ এবং গণতন্ত্র ও মানবিক সহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে।

এছাড়া তারা বলেন, দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে, যাদের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। নির্বাচন বিষয়ে তাদের স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং সময়োপযোগী মূল্যায়ন করার ক্ষেত্র ইতপূর্বে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।