ন্যাভিগেশন মেনু

আমার জন্মই হয়েছে শুধু বাঁশি বাজানোর জন্য: গাজী আব্দুল হাকিম


বাঁশির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির সম্পর্ক সুদীর্ঘকালের। হিন্দু মাইথোলজি, বিশেষ করে রাধা-কৃষ্ণ আখ্যানে  বাঁশি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেদিক থেকে চিন্তা করলে বাঁশি’র চর্চা এ উপমহাদেশে অনেক প্রাচীণ । বাঁশিকে এখন অবশ্য ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু, বাঁশির সঙ্গে শুরু থেকেই বাঁশের সম্পর্ক, গ্রামীণতার সম্পর্ক। ফোক মিউজিকে এটি অপরিহার্য।

খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার চেচড়ি গ্রামে বেড়ে ওঠা এক ছোট্ট বালক আজ দেশ বরেণ্য বংশীবাদক গাজী আব্দুল হাকিম। সুদীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে দেশে-বিদেশে অশেষ সুনাম অর্জন করেছেন। ২০২৩ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বংশীবাদকদের মধ্যে তাঁর রয়েছে একাধিক রেকর্ড। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে নিজের মেধা ও অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এই স্পষ্টভাষী শিল্পীর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় জীবনের অনেক কথা বলেছেন ’বাংলাদেশ পোস্ট’-এর সাথে। 

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন-বাংলাদেশ পোস্ট-এর নিজস্ব প্রতিবেদক,হোসাইন সাজ্জাদ।

বাংলাদেশ পোস্ট: বাল্যকালে আপনার বাঁশির সূচনাটা কিভাবে? বাঁশির প্রেমের পড়ার গল্পটা শুনতে চাই।

গাজী আব্দুল হাকিম: এক্কেবারে আমি যখন বুঝি না, বাল্যকালে, যখন আমার চারটা দাঁতই পড়ে নাই, তখন থেকেই আমার এই বাঁশিটা আমার হাতে। তখন আমি স্কুলেও যাওয়া শুরু করি নাই। এলাকায় মেলা, পূজা-পার্বণ হলে আমি বাঁশির দোকানের কাছে বসে থাকতাম। বাঁশি এবং গাজী আব্দুল হাকিম একে অপরের পরিপূরক। আমার জন্মটাই হয়েছে বাঁশি বাজানোর জন্য। আমি বেচে আছি বাঁশি  বাজানোর জন্য।

বাংলাদেশ পোস্ট: আপনি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাঁশি বাজিয়েছেন, তন্মধ্যে ইংল্যান্ডে হাউস অব কমন্স, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নসহ আরো অনেক দেশ রয়েছে, সে অভিজ্ঞতা যদি একটু বলেন।নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা সহজেই আপনাকে কাছে পায় যেটা তাদের কাছে সৌভাগ্যের ব্যাপার। নতুন প্রজন্ম যারা, তাদের মধ্যে কি এখনও বাঁশির প্রতি সেই টানটা আছে, যেটা আপনার সময়ে ছিল?

গাজী আব্দুল হাকিম:  সেই ট্রেন্ডটা এখন নেই । তবে, এখন অনেকে বাজাচ্ছে । হঠাৎ করে এসে রাতারাতি অর্থ হস্তগত, টাকা-পয়সা  কামানো যায় এখন। আমার কাছে এলে, এক থেকে দুই বছর শিখলে বাজানোটা  কিছুটা  শিখতে পারে মোটামুটি।

আমাদের সময়ে বর্তমান সময়ের মত প্রযুক্তিগত সুযোগ ছিল না। আমাদের সময় কঠিন পরিশ্রম করতে হত, সে সময় ইউটিউব চ্যানেল ছিল না। কোন কিছুই ছিল না। ওস্তাদের বাড়িতে যেয়ে, অনেক দূর, প্রায়ই কয়েক মাইল হেটে, তারপর ওস্তাদের কাছে শিখতে হত। তারপর তবলার সাথে প্র্যাকটিস করার জন্য আরো কয়েক মাইল দূরে যেয়ে আমাকে প্র্যাকটিস করতে হত। এত সুযোগ-সুবিধা তখন ছিল না। এখন তো সব হাতের নাগালে। এখন, গাজী আব্দুল হাকিম গুগলে সার্চ দিলে সব চলে আসে। ইউটিউবে সার্চ দিলে গান, ভিডিও চলে আসে।

বাংলাদেশ পোস্ট: আপনার বাঁশির ক্যারিয়ার প্রায় ষাট বছরের কাছাকাছি। আপনার বাল্যকালের বাঁশি শেখার গল্পটা শুনতে চাই।

গাজী আব্দুল হাকিম: আমার বয়স অফিসিয়ালি বলা হয় সত্তর বছর, কিন্তু আন-অফিসিয়ালি আমার বয়স আরো চার বছর বেশি হবে। আমার মনে হয়, এটা আমার মায়ের কথা। ভাষা আন্দোলন যে বছর হয়েছিল, সে বছর আমার জন্ম। স্কুলের শিক্ষক আমার জন্ম সন দিয়েছিল ১৯৫৬। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স আঠার কিংবা ঊনিশ বছর ।

আমি তখন বহুবার স্কুল পালিয়েছি। আমি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র ছিলাম। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল, সেই হিসেবে আমার অরিজিনাল বয়স ৭২বছর। চার-পাঁচ বছর বাদ দিলে আমার জীবনের পুরোটাই বাঁশি বাজিয়ে কেটেছে। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে আমাদের খুলনা অঞ্চলে যত নাটক, যাত্রা হত আমি স্কুল পালিয়ে হলেও সেসব অনুষ্ঠানে যাইতাম।

বাংলাদেশ পোস্ট: আপনার বাঁশির সুরে জনপ্রিয় ও বহুল পরিচিত অনেক গান, সিনেমায় আপনি বাঁশি  বাজিয়েছেন ,স্বনামধন্য অনেক সংগীত পরিচালক আপনার সুরে সংগীত পরিচালনা করেছেন। অনেক সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে আপনি বাঁশি বাজিয়েছেন। যেমন: মনের মানুষ, আগুনের পরশমণি। সে সময়কার কথা জানতে চাই।

গাজী আব্দুল হাকিম:  মনের মানুষ ‍সিনেমার পুরো গানের বাঁশি  এবং ব্যাকগ্রাউন্ড আমার করা। এটা করতে আমি ইন্ডিয়া গিয়েছি। আগুনের পরশমণি সিনেমার বাঁশি  পুরোটাই আমি বাজিয়েছি। কত গান, আর কত ক্যাসেট, মুভিতে আমি বাঁশি  বাজিয়েছি তার কোন হিসাব নাই। বাংলাদেশে এক সময় বলা হত যদি ১০০ টা গানের ক্যাসেট বের হত ,তার ৯৮ শতাংশ ক্যাসেটে আমি বাজাতাম। বাংলাদেশের এমন কোন আর্টিস্ট ছিল না, তাদের জীবনের প্রথম এ্যালবামে আমার বাঁশি বাজানো থাকত না।

রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ,সাদি মহম্মদ, সে যখন ১৯৮৪/৮৫ সালে ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশে এলের তখন ঝংকার স্টুডিও থেকে করা সাদি মহম্মদের প্রথম এ্যালবামে আমি বাঁশি বাজিয়েছি । রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার প্রথম ক্যাসেটও ঝংকার স্টুডিও থেকে করা। সুবীর নন্দীর আধুনিক বাংলা গানের প্রথম ক্যাসেট আমার করা। শাকিলার প্রথম আধুনিক বাংলা গানের ক্যাসেটও আমার করা। কলিম শরাফী, তার রেকডিংও আমার করা । শেখ লুৎফর রহমান সাহেবের, ফেরদৌসী রহমানের, ফিরোজা বেগমের অনেক গানে আমি বাঁশি বাজাইছি। সিনেমার গানে এত সংখ্যক বাজিয়েছি যে গুণে শেষ করা যাবে না। সামগ্রিকভাবে, যদি ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রির কথা বলতে হয়, তাহলে বলতে হবে, এদেশে যদি রবীন্দ্র সংগীতের ১০০ টা ক্যাসেট হত, তার ৯০টা এ্যালবামে  আমার বাঁশি  বাজানো থাকত। একইভাবে, নজরুলের ১০০ টা ক্যাসেট হত তাহলেও  ৯০ টা এ্যালবামে আমার বাঁশি বাজানো থাকত। এদেশে যদি লালনের গানের কথা বল হয়, একই ভাবে আমার বাঁশি  বাজানো থাকত। ক্যাসেটের যুগ পুরোটাই আমি পেয়েছি, সিডির যুগও পেয়েছি। সিনেমার যুগে আমি আলাউদ্দিন অর্কেস্ট্রাতে কাজ করছি। ঢাকা অর্কেস্ট্রাতে আমাকে বেজ বাঁশির জন্য কাজ করতে হয়েছে। টেলিভিশনে বিভিন্ন প্রোগ্রামে, এদেশে যত টিভি চ্যানেল আছে সব চ্যানেলেই বাঁশি বাজিয়েছি। সুতরাং, আমি একটা বর্ণাঢ্য জীবন পার করেছি। দেশে এবং বিদেশে শত শত কাজ করেছি। ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি, এনএসপিসহ আরো  অনেক বিদেশী মিডিয়াতেও আমার সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। ফ্রান্স রেডিও থেকে, নেদারল্যান্ড থেকে ’লাইভ ইন নেডারল্যান্ড’ মিডিয়াতেও আমার প্রোগ্রাম করেছে। সম্প্রতি বেলজিয়ামের দাদা রেকডিং স্টুডিও থেকে ওদের মিউজিকের সাথে, মিউজিক ডিরেক্টর লরেন্ট লোরন এর সাথে বাঁশি  বাজিয়েছি। এলেন বিয়ারোর সাথে ইউরোপ, আফ্রিকাতে বিভিন্ন প্রোগামের বাঁশি  বাজিয়েছি। ।

আমার বাঁশি বাজানো ও শিল্পী আদাম দুজনে মিলে লালনের ছয়টা গানের সাথে ভিউশন করে এই বছর ফান্স থেকে এ্যালবাম করা হয়েছে। বেলজিয়ামের অল আরকাইভ থেকেও আমার কাজ প্রচার হয়েছে।

মরোক্কোতে তাদের মিউজিকের সাথে বাঁশি বাজিয়েছি, টার্কিস মিউজিক, মরক্কোইয়ান মিউজিক, বাংলাদেশের মিউজিকের সাথে কম্বাইন্ডলি কাজ করেছি। অস্ট্রেলিয়ায় তাদের মিউজিকের সাথে, অর্কেস্ট্রার সাথে আমি বাঁশি বাজিয়েছি। আমার এ অর্জন, এত বড় অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আর কারো নেই। আমার মনে হয়, এই সাবকন্টিনেন্টে খুব কম মানুষের এরকম অভিজ্ঞতা আছে। জাকির হোসেন, পণ্ডিত হরী প্রাসাদ চৌরসীয়া অনেক বিদেশীদের সাথে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের আমার মত এরকম কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। আমার যে কাজগুলো ছিল তা কিন্তু শুধু বাঁশি বাজানো নয়, আমি বিদেশে গিয়ে শুধু বাংলাদেশের বাঁশি বাজাচিছ না বরং ওদের মিউজিকের সঙ্গে বাজাচ্ছি, তাদের অর্কেস্ট্রার সাথে বাজাচ্ছি। এটা একটা বিরল ঘটনা।

বাংলাদেশ পোস্ট: আপনার একটা এ্যালবাম ’৫২ থেকে ৭১’ সে এ্যালবামের বর্তমান অবস্থা  যদি একটু বলেন।

গাজী আব্দুল হাকিম:  ’৫২ থেকে ৭১’ এ্যালবামের অনেকগুলো স্টেজ শো আমি করেছিলাম। সেটা এখন ‘মাদারল্যান্ড’ নামে করছি। রিসেন্টলি, ”অনির্বাণ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা“ নামে বঙ্গবন্ধুর ৭১ থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা পর্যন্ত, ২৪ মিনিটের একটা অর্কেস্ট্রায় এ্যালবাম করেছি।

এটার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে । ইতোমধ্যেই, এটার উপর একটা স্টেজ শো করা হয়ে গেছে । সিডি আকারে সামনেই আসবে। এটা আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে দিতে চাই। এটা তো তাদেরই সম্পত্তি। এটা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে করা। বঙ্গবন্ধু মানে খোকা। সেই খোকার জন্ম হল ,সে বড় হল, বড় হয়ে বঙ্গবন্ধু হল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, সেখান থেকে একাত্তর এলো,তারপর বাংলাদেশ হল। এরপর পচাত্তর, এরপর শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ, পদ্মা সেতু, মেট্টোরেল সবই আছে অনির্বাণ : বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা এ্যালবামে। এটা শুধু অডিও নয়, ভিডিওসহ, অর্কেস্ট্রাসহ।

 বাংলাদেশ পোস্ট: আপনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযদ্ধের সময়কার স্মৃতি থেকে যদি কিছু বলেন, যদি জানতে চাওয়া হয়, গাজী আব্দুল হাকিমের উত্তরসূরী কারা?

গাজী আব্দুল হাকিম:  একাত্তরে  আমি  টগবগে যুবক। আমরা বন্ধুবান্ধব মিলে ২৪ জন  ছেলে একসঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে চলে যাই। একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে পাই রেডিওতে। আমি তো সাংঘাতিকভাবে অনুপ্রাণিত হই দেশ স্বাধীনের ব্যাপারে। এরপর আমরাও সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছি। লাঠিসোটা, গ্রাম্য হাতিয়ারসহ যার যা আছে তাই নিয়েই নিজেদের মতো প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করলাম। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকী আমার অনুগ্রাহী। আমিও তার অনুগ্রাহী। ১৯৭২ সালে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়।

বাঁশিশিল্পী বারী সিদ্দিকীর সাথে আমার খুব সখ্যতা ছিল। বারী সিদ্দিকীর যখন টেলিভিশনে চাকরি হয় ,তখন তিনি কমার্সিয়ালি বাজাতে পারতেন না। তখন তিনি সবাইকে বলতেন যদি কমার্সিয়াল বাজাতে হয় তবে গাজী আব্দুল হাকিমকে লাগবে। আমি কখনো কাউকে ছোট  করে দেখি না। এখন যারা রেডিও, টেলিভিশনে বাজাচ্ছে তারা অধিকাংশই আমার ছাত্র। আমার কাছে কেউ বাঁশি  বাজানো শিখতে চাইলে আমি কাউকে ফেরত দেইনা।

বাংলাদেশ পোস্ট:  আপনার জীবনী নিয়ে একটা বই প্রকাশ হবার কথা ছিল, সেটা এখন কোন অবস্থায় আছে?

গাজী আব্দুল হাকিম:  আমার জীবনী নিয়ে কাজ করছেন এল.এন পিয়েরো। আমার এক ছাত্র গৌর মজুমদার আমার জীবনী নিয়ে কাজ করছে। আরেক জন আছে রিপন নামে, সেও কাজ করেছে। তবে সেকাজগুলো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।  গাজী আব্দুল হাকিমের মিউজিক শেখার একাডেমিক প্রতিষ্ঠান ’অচিন পাখি’ ফরিদা পারভিন ফাউন্ডেশনের তত্ত্ববধানে পরিচালিত হয়, তেজগাঁও এলাকায়। এখানে গান, বাঁশি, একতারা, দোতারা ,গিটার, তবলা এবং অঙ্কন শিখানো হয়। আমি এখানে বাঁশি  বাজানো শিখাই।

বাংলাদেশ পোস্ট: গত বছর, আপনি একুশে পদক পেয়েছেন। শিল্পী হিসেবে অনেক বড় প্রাপ্তি এটা, আপনার অনুভূতি কী? এদেশের শ্রোতাদের প্রতি আপনার শিল্পীজীবনের অনুভূতি যেটা আপনি বলতে চান।

গাজী আব্দুল হাকিম: বংশীবাদক হিসাবে আমি একুশে পদক পেয়েছি ২০২৩ সালে। সেটা আমার জন্য অনেক সম্মানের।  ‍তিন বার চ্যানেল আই পুরস্কার পেয়েছি। এছাড়া আরো অনেক দেশি-বিদেশি সম্মানে আমি ভূষিত হয়েছি। আমার শিল্পের প্রাপ্তিটা দেশের থেকে বিদেশে বেশি ।

আমি একটা কথা বলতে চাই, রাষ্ট্রকে সাদী মহম্মদ এর মত  শিল্পীদের পালক হতে হবে। শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। যারা রাষ্ট্রের কর্ণধার ,বড় শিল্পপতী আছেন তাদের এই শিল্পীদেরকে লালন-পালন করতে হবে। আমি বাঁশি বাজাই, আমি শুধু বাঁশিই বাজাব। রাষ্ট্রকে আমি দেব, এ জাতিকে আমি দেব। আমি সারাক্ষণ প্র্যাকটিস করব। আমি কেন বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাব? আমি বাজারও করব, রান্নাও করব! এতসব কাজ করার পর কিভাবে বাঁশি বাজাব? মাথায় এতসব চিন্তা কাজ করলে কিভাবে আমি বাঁশি বাজাব? জাতিকে, দেশকে আমি কী দিব? জাতি আমার কাছ থেকে কী আশা করতে পারে? আমি ’মাদারল্যান্ড’ নামে যে এ্যালবাম করছিলাম সেটা বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত একটা পরিবেশনা। আর এখন যেটা করছি পলাশী থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। জাতি আমার কাছ থেকে আরো অনেক কিছু নিতে পারত। আমি সারাজীবন রেডিওকে দিয়েছি। ১৯৬৩ সাল থেকে আমি রেডিওকে দিয়ে আসছি। কিন্তু যতখানি আমার কাছ থেকে নেওয়ার কথা ছিল এ জাতি ততখানি কি নিতে পেরেছে?  রাষ্ট্র আমার কাছে যতটুকু নেওয়ার কথা ছিল তা কি নিতে পেরেছে? রাষ্ট্র আমাকে বলতে পারত:  এই দায়িত্ব তোমাকে দিলাম, তুমি সারাদিন বাঁশি বাজাবে, তুমি বিদেশে যাবে, দেশকে রিপ্রেজেন্ট করবে। ভারতে এ রকম কাজ হয়। তারা শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। আমাদের দেশে হাজার-হাজার শিল্পপতি, ব্যবসায়ী আছে তারা কী দুই চারজন শিল্পীর দায়িত্ব নিতে পারে না? তাহলে শিল্পীদের আর বাজারের চিন্তা করতে হয় না। সে শুধু শিল্প নিয়ে থাকবে। দেশকে ভাল কিছু দিবে। আমাদের দেশে একুইস্টিক মিউজিশিয়ান কমে যাচ্ছে , কয়েক বছর পর একজনও থাকবে না। আমার কাছে অনেকেই বাঁশি বাজানো শিখছে, দেশে-বিদেশে ভাল কিছু করছে, আমি তাদের মধ্যে জীবনবোধ, শিল্পবোধের বীজ রোপন করে দেই। বিখ্যাত বংশীবাদক জালাল আমার ছাত্র, বাবু আমার ছাত্র, ’বাংলাদেশ পোস্ট’ পত্রিকার এক্সিকিউটিভ এডিটর দুর্জয় আমার ছাত্র।  দুর্জয় আমার এখানে বাঁশি বাজানো শিখেছে, যদিও সে ক্যারিয়ার গড়েছে সংবাদপত্রে। আমার ছাত্ররা শিল্পবোধের শিক্ষার ভিত্তিটা নিয়ে যার যার মত এগিয়ে যাচ্ছে। আমি কারো কাছে কিছু প্রত্যাশা করিনা। ভাল মানুষ হতে হবে। ভাল বাজাতে পারলেই হবে না। ভাল মানুষ হতে হবে। ভাল বাজানো এক জিনিস, ভাল মানুষ হওয়া আরেক জিনিস। একজন গাজী আব্দুল হাকিম হতে সারাটা জীবন ভাল মানুষের সাধনা করতে হয়েছে। গাজী আব্দুল হাকিম একদিনেই হয়নি। গ্রামে-গঞ্জে , হাটে-ঘাটে-বাজারে যেখানেই যাবেন সেখানেই আমার বাঁশি সুর শুনতে পাবেন। গাজী আব্দুল হাকিমের সুর সবাই চেনে।

শুধু দেশ নয়, বিদেশেও আমাকে চেনে অন্যভাবে, সম্মানের চোখে দেখে। বিদেশে বাংলাদেশি আর্টিস্টকে কতজন চিনে? সেভাবে চিনে না। বিদেশে এমনও আছে বাংলাদেশকে চিনে না ,কিন্তু গাজী আব্দুল হাকিমকে চেনে।

বাংলা গানতো সবাই বুঝে না, বাংলা শিল্পীকেও সেজন্য সবাই চিনে না। পাকিস্তানে তো আর বাংলা গান বুঝে না। উর্দু হলে বুঝত। একজন হিন্দীভাষী তো আর বাংলা গান বুঝবে না। । যেমন রুনা লায়লাকে বাংলাদেশে, ভারতে এবং পাকিস্তানে ভাল করে চিনে

বাংলাদেশ পোস্ট:  জাপানসহ বিদেশে অনেক গুণী শিল্পীদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আপনার। আমাদের যদি সে বিষয়ে একটু বলেন।

গাজী আব্দুল হাকিম:  জাপানে ফুকুওকা এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে আমি বাঁশি  বাজিয়েছি। আমি নিজে জাপানের রাজার সাথে বাঁশি বাজিয়েছি। রাজা নিজে বলেছে একটা নয় দুটো গান বাজাতে। এই যে প্রাপ্তিটা সেটা আমার একার না। রাষ্ট্রও এর ভাগীদার। বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানে ফরিদা পারভিনকে ভাল করে চিনে কারণ ফরিদা পারভিন বাংলা গানের পাশাপাশি হিন্দিতে লালনের গান করেছে ।

সরকারেরও দায়িত্ব আছে শিল্পীদের দেখার। বিদেশ থেকে বড় পুরস্কার পেতে সরকারকেও এগিয়ে যেতে হবে। ফরিদা পারভিনের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে উল্টো। আল্লাহ তার সহায় ছিল। ফরিদা পারভিন জাপানে ‍ফুকুওকা কমিটি করেছে, সেই কমিটিতে কাজ করার পর জাপানীরা ফরিদা পারভিনকে চিনেছে । জাপানে এমন কোন বাচ্চা নেই যারা ফরিদা পারভিনকে, গাজী আব্দুল হাকিমকে চিনে না।

একমাসের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন স্কুলে প্রোগাম করেছি। বিভিন্ন শহরে কাজ করেছি। জার্মান, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, মরোক্ক, তিউনেশিয়া, আলজেরিয়ায় সেখানে গাজী আব্দুল হাকিমকে সবাই চেনে। তার কারণ বাঁশি, বাঁশির ভাষা হল সর্বজনীন। যেটা সবাই বোঝে। মিউজিক হল সর্বজনীন ভাষা। আপনি কষ্টের সুর বাজাচ্ছেন, নাকি হাসির সুর বাজাচ্ছেন সেটা সবাই বুঝে ফেলে। বাংলা ভাষায় আমাদের কথা কিন্তু সবাই বুঝে না।

রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকতে প্রণব মুখার্জী, শর্মিলা ঠাকুর এসেছিল। তখন ভারতীয় এ্যাম্বাাসির তত্ত্বাবধানে “বাঁশিওয়ালা” কবিতাটি পাঠের সময় আমি বাঁশি  বাজিয়েছিলাম । তখন শর্মিলা ঠাকুর বলেছিলেন, ”আমি আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি একজন মিউজিসিয়ান দিয়ে বাঁশিবাজানোর জন্য”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বলল প্রণব মুখার্জি এবং শর্মিলা ঠাকুর তোমার বাঁশি বাজানোর যে প্রশংসা করলেন, আমরা গর্বিত। শর্মিলা ঠাকুর বলেছিলেন, ”সারা ভারতীয় উপমহাদেশে এরকম বাঁশি বাদক আর দ্বিতীয়টি নেই”।  

 

বিখ্যাত আমেরিকান টিভি সিরিজ ‘ম্যাকগাইভার’ এর কেন্দ্রিয় চরিত্র ম্যাকগাইভারের ভূমিকায় অভিনয়কারী রিচার্ড ডীন এন্ডারসনের সাথে লন্ডনে আমার দেখা হবার পর আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল তার দেশে থেকে যাওয়ার জন্য। হলিউডে আমার বাজানো বাঁশি দিয়ে ডকুমেন্টারি করা হয়েছে।

অষ্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাতে আমাদের দেশ থেকে বড় বড় আর্টিস্ট নিয়ে একটা প্রোগাম হয়েছিল। সেখানে গান গাওয়া বাদ রেখে বিশ মিনিটের অর্ধেক সময় ধরে আমার বাঁশি শুনেছে সবাই । সবাই কে সেখানে পারফর্ম  করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

 

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আমি বাঁশি বাজিয়েছি যা আগে কোন বাঁশি বাদকের জন্য হয়নি। এত প্রাপ্তি আমার! এক জীবনে অনেক বেশি।

নাইজেরিয়াতে বাংলাদেশের এ্যাম্বাসেডর শামীম সাহেবের তত্ত্বাবধানে এক অনুষ্ঠানে গান দিয়ে অনুষ্ঠান জমে উঠছিল না। যেই আমি আমার বাঁশি  বাজানো শুরু করলাম, অনুষ্ঠান জমে উঠল। আমাদের দেশে যখন কোন বিদেশী আসেন তখন সেই প্রোগ্রামে গানের শিল্পী আনা হয়, গান নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই। এমন কাউকে নিবেন যিনি দেশকে উপস্থাপন করতে পারেন। আপনি যদি ভারতের দিকে তাকান দেখতে পাবেন, আমজাদ আলী খান, বিসমিল্লাহ খান, রবি শংকর ভারতকে রিপ্রেজেন্ট করে। বিদেশে যখন বাংলাদেশের শিল্পীদের কোন প্রোগ্রাম হয় বিশ জনের দলে এক-দুইজন নেওয়া হয় মিউজিশিয়ান। কিছু  ক্ষেত্রে মিউশিয়ান থাকেই না। নেওয়া হয় কী বোর্ড।

একবার সুইজ্যারল্যান্ডে এক প্রোগ্রামে আমাকে আমার তানপুরাটাও বাজাতে দেয়া হয়নি । তারা একুইস্টিক জিনিস পছন্দ করে। আর আমরা একুইস্টিককে বিসর্জন দিয়ে উল্টো কাজ করছি। ফুটবলকে যেমন একসময় রিপ্রেজেন্ট করত ম্যারাডোনা, এখন মেসি, বাংলাদেশে ক্রিকেটকে যেমন রিপ্রেজেন্ট করতে সাকিবকে বিদেশ পাঠাচ্ছি, তেমনি এদেশের ক্লাসিক মিউজিককে রিপ্রেজেন্ট করতে এরকম কোন মিউজিশিয়ানকে পাঠানো উচিত। আধুনিক কীবোর্ড সংগীত, এদেশের সংগীতের পরিচায়ক নয়।

নতুন যারা বাঁশির জগতে আসতে চায় তারা মনে প্রাণে বাঁশি কে ভালবেসে তবেই বাঁশির জগতে আসতে পারে। বাঁশি আমার আত্মা, আমার জীবন। আমি দুবেলা না খেয়েও থাকতে রাজি , কিন্তু বাঁশি  ছাড়া থাকতে পারব না। বাঁশি কে ভালবেসে, সঠিক ওস্তাদের কাছে, সঠিক গুরুর কাছে তালিম নিতে হবে। শুধু ইউটিউব বা অনলাইনে বাঁশি বাজানো শেখা সম্ভব না। অন্য অনেক কিছু ইউটিউব দেখে শেখা যাবে কিন্তু বাঁশি নয়। বাঁশির রাগ বুঝতে হবে, কোনটা ভৈরবীর কোমল ধা আর ভাঁয়রোর কোমল ধা এক হবে না। যদিও একই কমল ধা। বাঁশির রাগ অনুসারে পার্থক্য হবে। বাঁশিকে ভালবাসলেই বাঁশি সঠিক সুরে বাজবে।

বাংলাদেশ পোস্ট: ধন্যবাদ, সময় দেওয়ার জন্য।

গাজী আব্দুল হাকিম:  আপনাকেও ধন্যবাদ।