NAVIGATION MENU

২০২০ সালে বিশ্বের সেরা ১০ ঘটনা


আনন্দ, উৎসাহ, বেদনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পুরো ২০২০ সাল ছিল আলোচিত। করোনা মহামারির জন্য ইতিহাসের পাতায় বড় করে লেখা থাকবে বছরটির কথা। ২০২০ সালে বিশ্বে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বেশি আলোচিত ১০ টি ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)। চলুন দেখে নেওয়া যাক সিএমজি নির্বাচিত বছরের সেরা ১০ টি ঘটনা:

ঘটনা এক: করোনা মহামারির বিরুদ্ধে সমন্বিত লড়াই ও বিজ্ঞানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য

শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক মহামারিতে পরিণত হয়েছে করোনা ভাইরাস মহামারি। ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই মহামারিতে বিশ্বে সাড়ে ১৭ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়া এই মহামারি বিশ্বের সকল দেশ ও জাতির জন্য শত্রুতে পরিণত হওয়ায় এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করছে এবং এবং এর বিস্তার রোধে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

চিনের তৈরি করোনার ভ্যাকসিন বিশ্বব্যাপী জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটির নেতারা। পাশাপাশি এই মহামারি ঠেকাতে যাবতীয় সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্বের বৃহত্তম সরবরাহকারী হওয়ার দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে চিন।

ঘটনা দুই: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বহুপাক্ষিকতা এবং বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা জোরদার করার আহ্বান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের

জাতিসংঘের (ইউএন) সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশন ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। মহামারির কারণে অধিবেশনটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বহুপাক্ষিকতা ধরে রাখার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করার আহ্বান জানায়। অধিবেশনে চিনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং জানান, চিন সব সময় বহুপাক্ষিকতার চর্চা করবে। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা সংস্কার ও নির্মাণে চিন সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে বলেও জানান তিনি। এছাড়া মানবজাতির জন্য অভীন্ন ভবিষ্যত নির্মাণে চিন সম্প্রদায় গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে বলে জানান তিনি।

চিন নিজেদের বৃহত্তম মানবিক উদ্যোগও শুরু করেছে এবং মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

ঘটনা তিন: মহামারির সত্তেও বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র চিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই প্রথম করোনা মহামারির সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পড়েছে। এই মহামারির সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে পৌছেছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার মার্কেট ১০ দিনের মধ্যে চারবার সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। এছাড়াও বিশ্বে শেয়ারবাজার, বন্ডের বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং পণ্যের বাজারে উঠানামা অব্যাহত ছিল। এই ধাক্কার পর বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুরোনো রূপে ফিরতে শুরু করে। ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৪.৪ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে ভবিষ্যতবাণী করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

মহামারীটির প্রভাব কাটিয়ে উঠে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব দেয় চিন। চিন বিশ্বের একমাত্র বড় অর্থনীতির দেশ যেটি এই বছর ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২১ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অবদান রাখবে চিন।

ঘটনা চার: ১৫টি দেশের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর 

আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ এবং চিন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কোরিয়া এবং নিউজিল্যান্ড ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (আরসিইপি) স্বাক্ষর করে। আরসিইপি’র মাধ্যমে বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার জন্য মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, বৈচিত্রপূর্ণ সদস্যপদ কাঠামো এবং বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়ন সম্ভাবনার জন্ম হয়।

বর্তমানে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন উল্টোপথে অবস্থান করছে। তাই এই ১৫টি দেশের আনুষ্ঠানিকভাবে আরসিইপির অংশ হওয়াকে বহুপাক্ষিকতা এবং অবাধ বাণিজ্যের জন্য একটি বিজয় হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিমত দিয়েছেন অনেকে।

ঘটনা পাঁচ: ইরানের উপর আমেরিকার মাত্রাতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ

তিন জানুয়ারি মার্কিন সেনারা এক প্রবীণ ইরানি জেনারেলকে হত্যা করে এবং ইরানের উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে। এছাড়াও কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাওয়া ইরানের ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করে, সর্বসম্মতভাবে যার বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

২০২০ সাল ছিল ইরানের পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের পঞ্চম বার্ষিকী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরম চাপের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান প্রক্রিয়া অত্যান্ত শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায়।

এ ছাড়া সিরিয়া ও লিবিয়ায় অশান্তি অব্যাহত রয়েছে। সিরিয়ার ইদলিবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছায় রাশিয়া ও তুরস্ক। তবে সিরিয়ার সাংবিধানিক কমিটির চতুর্থ বৈঠকে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। পরে লিবিয়ায় সংঘাত ইস্যুতে দুই পক্ষ একটি ‘স্থায়ী’ যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও অনেকটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ঘটনা ছয়: ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের হার কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ চীনের

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্যারিস চুক্তির পঞ্চম বার্ষিকী উপলক্ষে ১২ ডিসেম্বর যৌথভাবে একটি অনলাইন সম্মেলনের আয়োজন করে জাতিসংঘ এবং যুক্তরাজ্য।

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার জন্য প্যারিস চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। প্যারিস চুক্তির সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে চিন আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের হার সর্বোচ্চ মাত্রায় কমিয়ে আনতে এবং ২০৬০ সালের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনতে কাজ করে যাবে।

ঘটনা সাত: আফ্রিকার মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল

করোনা মহামারির কারণে উদ্বোধনের তারিখ পরিবর্তিত হওয়ার পর অবশেষে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া - এএফসিএফটিএ)।

কাজ শুরু করলে ১৯৯৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এএফসিএফটিএ পৃথিবীর বৃহত্তম নতুন অর্থনৈতিক সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। যাত্রা শুরু করলে আফ্রিকার প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মানুষকে একত্রিত করবে এএফসিএফটিএ। আর ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় তিন কোটি আফ্রিকানকে চরম দারিদ্র্যের কবল থেকে বের করে আনবে এবং প্রায় ৭০ কোটি মানুষকে মধ্যম দারিদ্র অবস্থার বাইরে নিয়ে আসবে।

ঘটনা আট: জর্জ ফ্লয়েড হত্যা ও ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন

পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন জর্জ ফ্লয়েড নামের একজন আফ্রিকান আমেরিকানকে হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে পুরো আমেরিকা। ২৫ মের ওই ঘটনার ফলে অবস্থা এমন হয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। এসময় অনেক জায়গায় দাঙ্গা এবং সহিংস সংঘর্ষ শুরু হয়। পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পরে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন, যা পর্যায়ক্রমে বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়ে। 

যুক্তরাষ্ট্রের সদ্যসমাপ্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বর্ণবাদ অনেক বড় একটি বিষয় হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। একই ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে বড় ধরনের মেরুকরণ হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এর বাইরেও, ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়। এছাড়াও দেশটি ওপেন স্কাইস ট্রিটি বা নিরাপদ আকাশ চুক্তি, প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের কার্যক্রম দেশটিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করেছে।

ঘটনা ৯: 'মঙ্গল গ্রহের বছর' এবং চীনের ঐতিহাসিক চাঁদ মিশন

২০২০ সালকে বলা হচ্ছে ‘মঙ্গল গ্রহের বছর’। গেল বছরের ২৩ শে জুলাই চিনের উদ্যোগে মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধান মিশন পরিচালনায় তিয়ানওয়েন-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। চিন ছাড়াও জুলাই মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধানের জন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে।

‘প্রদক্ষিণ, অবতরণ এবং ফিরে আসা’ এই তিন পদক্ষেপ পরিকল্পনার নিখুঁত বাস্তবায়ন করে চন্দ্রপৃষ্ঠের নমুনা সংগ্রহ করে ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখ ভোরে পৃথিবীতে ফিরে আসে চিনা চন্দ্রযান ছ্যাং এ -৫। চিনা চন্দ্রযানের এই সফলতা ও নমুনা সংগ্রহ ভবিষ্যতে চাঁদ সম্পর্কিত গবেষণার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঘটনা ১০: নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলের দ্বন্দ্ব

গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে নতুন দফায় দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পরবর্তীতে ১০ নভেম্বর থেকে ওই অঞ্চলে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ৯ নভেম্বর একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে দুই পক্ষ।

বিবৃতি অনুসারে, রাশিয়া ওই অঞ্চলে শান্তিরক্ষা মিশন শুরু করে এবং যুদ্ধবিরতি যৌথ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে তুরষ্কের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু এরপরও ওই দুই দেশের মধ্যে এখনো বৈরিতা বিরাজ করছে। নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে সংঘর্ষের ফলে বেসামরিক নাগরিকসহ ৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় আর বাস্তুচ্যুত হয় কয়েক হাজার মানুষ।